Spread the love
সোহরাফ হোসেন সৌরভ: উপবৃত্তির টাকা দিয়ে খাতা কেনে, কলম কেনে, প্রাইভেটের টাকা দেয় শিশু শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেন। তবে এবার আর সেই টাকা তার ভাগ্যে জোটেনি। সেই টাকা চলে গেছে প্রতারকদের পকেটে। শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা ও ‘নগদ’র লোক সেজে ফোন দিয়ে বোনের কাছ থেকে ওটিপি(ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) নিয়ে সেই টাকা তুলে নিয়েছে প্রতারক চক্র।
সাব্বির হোসেন সাতক্ষীরা সদরের শ্যাল্যে গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে।শুধু সাব্বির হোসেনের উপবৃত্তির টাকা নয়,01874979162,01819767755,
01880775268 এমন নম্বরের মাধ্যমে কল দিয়ে চালাকী করে শাল্যে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪০ জনেরও বেশী শিক্ষার্থীসহ সাতক্ষীরার শতশত প্রাইমারী ও হাইস্কুলের শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ওই প্রতারক চক্র।
প্রতারকরা টাকা হাতিয়ে নেওয়ায় অনেক দুঃখ পেয়েছে সাব্বির হোসেন। তার কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সে দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বলে, ‘উপবৃত্তির টাকা নিয়ে আমরা খাতা কিনি, কলম কিনি, প্রাইভেটের টাকা দেয়। প্রতারকরা আমাদের সেই টাকা নিয়ে নেছে। এতে আমরা খুব দুঃখ পেয়েছি।’সরেজমিনে শাল্যে-মাছখোলা গ্রামে গেলে শ্যালে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী সিয়াম হোসেনের মা মনোয়ারা খাতুন, সাব্বির হোসেনের বোন সানজিলা খাতুন বলেন, ‘কয়েকদিন আগে সকালে মোবাইলে কল দিয়ে আমাদের কাছে পিন নম্বর চাই প্রতারক চক্র। প্রথমে আমরা পিন নং দিতে রাজি না হলে তারা বলে পিন নং না দিলে মোবাইলে টাকা আসবে না। এখন যদি আপনার মোবাইলের ম্যাসেজে দেওয়া পিনটি আমাদের বলেন তবে দুপুরের ভেতর উপবৃত্তির টাকা মোবাইলে চলে যাবে। তখন আমরা সরল বিশ্বাসে পিন নম্বরটা দিয়ে দেয়। এরপর আমরা এলাকাবাসীর কাছে ও স্কুলের স্যারের কাছে গেলে তারা মোবাইল চেক করে বলে উপবৃত্তির টাকা মাবাইলে এসেছিল। তবে এখন নেই। আপনাদের টাকা উঠানো হয়ে গেছে।’তারা আরো বলেন, ‘এর আগে শিওর ক্যাশের মাধ্যমে টাকা দেওয়া হতো তখন এমন প্রতারণা হয়নি। মোবাইলে টাকা ঢুকলেই একটা ম্যাসেজ দিতো। তখন আমরা বুঝতে পারতাম। তবে ‘নগদ’ এ টাকা আসলেও কোন ম্যাসেজ দেয়নি আমাদের মোবাইলে। তাহলে আমরা কিভাবে বুঝবো, টাকা এসেছে নাকি আসেনি? আমরা ভেবেছি তাদের কথামতো পিন দিলে টাকা আসবে। তবে যদি জানতাম প্রতারকরা এটা করছে তাহলে আমরা কখনও পিন দিতাম না।’

এদিকে স্থানীয় এলাকাবাসী মিতা খাতুন বলেন, ‘আমাদের এলাকার ট্রলিচালকসহ অনেকের কাছে ফোন দিয়ে ‘সার’ সম্বোধন করে পিন নং নিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ওই প্রতারক চক্র! শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে দাবি, ‘তারা যেন অভিভাবকদের সচেতন করে। এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে।’

মিতা খাতুনের কথার সাথে একমত পোষণ করে ওই এলাকার কলেজ ছাত্রী ফারহানা আক্তার জ্যোতি বলেন, ‘আগে মোবাইলে টাকা দিলে এমন ঘটনা ঘটেনি। তবে নগদ একাউন্ট খোলার পর এবার প্রতারক চক্র আমার এলাকার অনেক অভিভাবকদের কাছ থেকে ওটিপি পিন নং নিয়ে নিজেদের মত পিন সেট করে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।’
প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি আরে বলেন, ‘অভিভাবকদের এই মোবাইল নম্বরে উপবৃত্তির টাকা দেবে বা দেছে এটা স্কুল কর্তৃপক্ষ, সিম কোম্পানি ও নগদ কোম্পানীর লোকজন ছাড়া অন্য কারো জানার কথা না। তবে এই প্রতারক চক্র ওই নম্বর পেল কিভাবে?’

ঘটনার পরপরই অনেক অভিভাবক স্কুলে এসে এ ব্যাপারে অভিযোগ করেছেন বলে জানিয়েছেন শাল্যে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা আমেনা খাতুন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের স্কুলের ১৫২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৩৫ জন শিক্ষার্থী উপবৃত্তির আওতায়। এর মধ্যে ৪০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী প্রতারকদের প্রতারণার শিকার হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আমাদের বিষয়টি জানিয়েছেন। আমরা তাদেরকে ডেকেছিলাম এবং তাদের ফোন চেক করেছিলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাদের ফোন হতে আগেই টাকা তুলে নিয়েছে প্রতারক চক্র। এছাড়া যে সকল অভিভাবকের কাছে এখনও কল দেয়নি প্রতারক চক্রটি তাদেরকে কোনভাবেই পিন না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছি।’

পশ্চিম মাছখোলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুরমান আলী বলেন, ‘অনেক অভিভাবক না বুঝে পিন নম্বর দিয়ে প্রতারিত হয়েছেন। বিষয়টি জানার পর উপজেলা শিক্ষা অফিসার আমাদের জানিয়েছিলেন। তার নির্দেশনায় আমরা অভিভাবকদের সচেতন ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য অভিভাবক সমাবেশ করেছি। এবং কোন ভাবেই পিন নম্বর দিয়ে প্রতারিত না হওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছি।’

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল গনি বলেন, ‘সাতক্ষীরা সদরের ২১৩ টি বিদ্যালয়ের ৩৩ হাজার ৭৮৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তার মধ্যে ৩২০৫৩ জন শিক্ষার্থী উপবৃত্তির আওতায় আছে। প্রতি ৩ মাস পরপর মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে প্রাক প্রাথমিকের প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ৩ মাসে ২২৫ টাকা ও প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণীর প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ৪৫০ টাকা করে দেওয়া হয়।’

প্রতারণার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘একটি প্রতারক চক্র পিন নং নিয়ে টাকাটা তুলে নিচ্ছে এমন অভিযোগ খুব অল্প সংখ্যক বিদ্যালয় থেকে এসেছে। এ ব্যাপারে অধিদপ্তর থেকে পত্র এসেছে। আমরা ইতিমধ্যে বিষয়টি প্রত্যেক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে অবগত করেছি । তারা অভিভাবক সমাবেশ করে মা ও অভিভাবকদের সচেতন করেছেন। কোনভাবেই যাতে কাউকে পিন নং দেওয়া না হয় সে ব্যাপারে অভিভাবকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *