Spread the love

এসভি ডেস্ক: সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো সরকারের কাছে  সংলাপে বসার দাবি জানিয়ে অাসছিল অনেকদিন ধরেই। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে চিঠি পাঠানোর পর পরই বরফ গলতে শুরু করে। সংলাপের আহ্বান বার বার প্রত্যাখান করা ক্ষমতাসীন দল নমনীয় হয়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বনে সাড়া দেন প্রধানমন্ত্রী। 

গণভবনে  বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে  সংলাপে বসছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। এদিন সন্ধ্যায় ড. কামাল হোসেন, মির্জা ফখরুলসহ ১৬ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে গণভবনে সংলাপে বসবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোটের ২১ নেতা। গণভবনের এই সংলাপ নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে আগ্রহ, চলছে নানা জল্পনা।

কেবল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নয়, বিকল্পধারার সংগেও সংলাপে বসতে সম্মতি জানিয়ে চিঠি দিয়েছে আওয়ামী লীগ। শুক্রবার তারা গণভবনে আসার আমন্ত্রণ পেয়েছেন। পাশাপশি  সংলাপে বসার আগ্রহ জানালে জাতীয় পার্টি  চেয়ারম্যান এরশাদকে ৫ নভেম্বর গণভবনে সংলাপে  বসার  অামন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে অন্যদের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে অনুষ্ঠেয় সংলাপটিই।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে ড. কামালের নেতৃত্বে সংলাপে অংশ নেবেন জোটের ১৬ নেতা। প্রতিনিধি দলে বিএনপির পক্ষ থেকে থাকবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার রয়েছেন। নাগরিক ঐক্য থেকে মাহমুদুর রহমান মান্না ও এসএম আকরাম। গণফোরাম থেকে রয়েছেন মোস্তফা মহসিন মন্টু ও সুব্রত চৌধুরী। জেএসডি থেকে আছেন আ স ম আব্দুর রব, আব্দুল মালেক রতন ও তানিয়া রব। ঐক্য প্রক্রিয়া থেকে আছেন সুলতান মুহাম্মদ মনসুর ও আ ব ম মোস্তফা আমিন। আর স্বতন্ত্র হিসেবে রয়েছেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

সংলাপে ১৪ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে সংলাপে অংশ নিবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, কাজী জাফরউল্লাহ, দিলীপ বড়ুয়া, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, মাঈনুদ্দিন খান বাদল, অ্যাডভোকেট আনিসুল হক, ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, রমেশ চন্দ্র সেন, মাহবুবউল-আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, আব্দুর রহমান, ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, হাছান মাহমুদ, অ্যাডভোকেট শ. ম. রেজাউল করিম।

সংলাপে বসার এসব উদ্যোগে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বস্তি ফিরলেও উভয় পক্ষের বেশকিছু শর্ত শংকাও তৈরি করছে। ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড, কামাল হোসেনকে সংলাপের আমন্ত্রণ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সংবিধান সম্মত সকল বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। অনেকেরেই প্রশ্ন, এর মানে কি এই যে প্রধানমন্ত্রী সংলাপে রাজি হলেও ‘বর্তমান সংবিধানে যা আছে সেভাবেই নির্বাচনের’ অবস্থান থেকে নড়ছেন না?

এদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান দাবিই হলো, ‘সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। কিন্তু এটা করতে হলে সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হবে। কিন্তু সরকারি দল সংবিধানের বাইরে যেতে আগ্রহী নয়। এক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠেছে, বিরোধীদের দাবি মেনে কতটুকু ছাড় দেবেন প্রধানমন্ত্রী! উপেক্ষিত হলে বিরোধীদের সামনেই বা বিকল্প কি?

শুরুতে সংলাপের জন্য চিঠি আদান প্রদানে বেশ উদ্দিপনা ছাড়ালেওবৃহস্পতিবার যে সংলাপ গণভবনে শুরু হচ্ছে তার পরিণতি শেষ পর্যন্ত কি দাঁড়াবে তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তো বটেই, বিশ্লেষকদের মধ্যে, এমনকি সাধারণ মানুষদের মধ্যেও।

বাংলাদেশে গত প্রায় তিন দশক ধরে মীমাংসা আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে যে সব চেষ্টা হয়েছে তাতে সাফল্যের নজির নেই বললেই চলে। তত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুতে সৃষ্ট সঙ্কট নিরসনে ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘ মহাসচিব মধ্যস্থতার জন্য তার একজন দূত পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু তা সফল হয়নি। ২০০৪ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মহাসচিব পর্যায়ের দীর্ঘ সংলাপেও কোনো লাভ হয়নি, যার জের ধরে ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত একটি সরকার ক্ষমতা নিয়ে নেয়। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি যাতে অংশ নেয়, তা নিশ্চিত করতে বিদেশীদের মধ্যস্থতায় মীমাংসার একাধিক চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছিল।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে সংলাপের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে অনড় থাকা আওয়ামী লীগ হঠাৎ করে সংলাপে সম্মতির বিষয়টি আগামীর রাজনীতির জন্য ‘মাইলফলক’ বার্তা বয়ে আনতে পারে। একই সঙ্গে তারা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, শেষ পর্যন্ত কার্যকর সংলাপ হবে তো? নাকি নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত সংলাপের পরিণতির দিকে যাবে! নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির (আব্দুল জলিল-আব্দুল মান্নান ভূইয়া) মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। তেমনি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও ২০১৪ সালে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিবের সহকারী ফার্নান্দেজ তারানকোর নেওয়া উদ্যোগের ফলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে সংলাপের মতো ফের লোক দেখানো আরেকটি প্রহসনের সংলাপ হবে?